কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই কি প্রোগ্রামারদের জায়গা দখল করে ফেলবে?

সত্যিই কি একদিন এআই প্রোগ্রামারদের জায়গা নেবে?

 
ভবিষ্যতে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বদৌলতে একটি সফটওয়্যার নিজেই নিজেকে কোড করতে সক্ষম হবে। অথবা শুধুমাত্র সফটওয়্যারের মাধ্যমেই সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন কোনো সফটওয়্যার নির্মাণ সম্ভব হবে। 
 
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই কি প্রোগ্রামারদের জায়গা দখল করে ফেলবে?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই কি প্রোগ্রামারদের জায়গা দখল করে ফেলবে?

 

সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট এর ভবিষ্যৎ নিয়ে গুগল এর বর্তমান সিইও সুন্দার পিচাই এমনটাই অনুমান করছেন। তার কথা হয়তো আসলেই সত্যি। কিন্তু তাই বলে সফটওয়্যার ডেভেলপাররা যে অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাবেন, বিষয়টা তাও না।
 
এআই কি নিকট ভবিষ্যতে কম্পিউটার প্রোগ্রামারদের জায়গা দখল করতে পারবে? আদৌ কি কখনো প্রোগ্রামারদের পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হবে? হয়তো এমনটা হতে পারে যখন আমরা খুব শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করতে পারব। 
 
এমন সম্ভাব্য শক্তিশালী এআই এর নাম দেয়া হয়েছে ‘আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স’ বা সাধারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। ধারণা করা হচ্ছে এআই প্রযুক্তি এই পর্যায়ে পৌঁছে গেলে সেখানে মানব মস্তিষ্কের সকল গুণ থাকবে।
 
যত যাই হোক, শিরোনামে থাকা মূল প্রশ্নটির উত্তর আসলে সহজ: অদূর ভবিষ্যতেই এআই এর সাহায্যে আমাদের কাজের পরিসর অনেক বেড়ে যাবে। এবং কম্পিউটার প্রোগ্রামাররা হয়ে উঠবে “এআই প্রোগ্রামার”।
 
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যে প্রতিনিয়ত প্রোগ্রামিংয়ের কাজে আরো ভাল করছে, তা কেউই অস্বীকার করতে পারবে না। বিভিন্ন ধরনের এআই টুল ব্যবহার করে এক সময় মানুষের চেয়ে ভাল প্রোগ্রামিং করা যাবে, তা নিয়েও সবাই নিশ্চিত। 
 
কিন্তু মানুষের সাহায্য ছাড়া পুরোপুরি স্বাধীনভাবে কাজ করতে এআই এর এখনো অনেক সময় লাগবে। কারণ স্বাধীনভাবে বাস্তবে কাজে লাগানোর মত কয়েক লাইনের ছোট একটা কোড লিখতেই এমন বুদ্ধিমত্তার প্রয়োজন, যেটার সাথে তুলনা করা যায় বিখ্যাত “টেকনোলজিকাল সিংগুলারিটি”র ধারণা। 
 
তবে ভবিষ্যৎ না, বর্তমানেই প্রোগ্রামারদের আর নিজের হাতে সম্পূর্ণ কোড লেখার দরকার হচ্ছে না। প্রোগ্রামাররা ইতোমধ্যেই বিভিন্ন ধরনের টুল ব্যবহার করছে, যা দিয়ে তাদের কোডিং এর কাজের অনেকটাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে করা সম্ভব হচ্ছে। 
 
এআই আসলে প্রোগ্রামারদের সাহায্য করার কাজটাই করে থাকে। তবে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিজের বুদ্ধি দিয়ে একটা সফটওয়্যার তৈরি করবে অথবা সফটওয়্যারের প্রতিটা ফিচারের ব্যবসায়িক মূল্য হিসাব করতে পারবে, এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বাজারে আসতে এখনো অনেক দেরি।
 
অধিকাংশ এআই ভিত্তিক টুল নির্দিষ্ট কাজে দক্ষ এবং নির্ভুল হয়ে ওঠার জন্যে মেশিন লার্নিং এর ওপর নির্ভর করে। আর মেশিন লার্নিং কাজ করে ‘নিউরাল নেটওয়ার্ক’ এর মাধ্যমে, যাতে ‘ট্রায়াল অ্যান্ড এরর’ বা বিভিন্ন পন্থায় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পদ্ধতি কাজে লাগানো হয়। মূলত এভাবেই আমাদের নানান কাজ আরো সহজ আর নির্ভুল করে তোলে এআই।
 
বর্তমানে ভুল খোঁজা এবং সংশোধন করার ক্ষেত্রে মানুষের চেয়েও ভালভাবে কাজ করে মেশিন। কিন্ত মেশিন সম্ভবত কখনোই নিজের “মতামত” তৈরি করার মত স্বয়ংক্রিয় হতে পারবে না। কোন পদ্ধতিতে কাজ করলে দক্ষতার সাথে একটা সমস্যার সমাধান করা যাবে বা সফটওয়্যারে নতুন কোন ফিচারটা যুক্ত করা উচিৎ, সে ব্যাপারে মেশিনের দক্ষতা নেই।  
 
এক সময় হয়তো দেখা যাবে মানুষ প্রোগ্রামিং শেখা বাদ দিয়ে কেবল মেশিন লার্নিং টুল ব্যবহার করা শিখবে, যাতে নিজের কাজগুলি আরো দক্ষভাবে করা যায়। এআই তখন জটিল অনেক কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই করে ফেলবে। ফলে সৃজনশীল ও মানবীয় কাজগুলিতে মনোযোগ দেয়ার জন্যে অনেক সময় থাকবে ডেভেলপারদের হাতে।
 
মোটকথা মেশিন যেসব কাজ করতে পারবে না, সেগুলি করার জন্যে সব সময়ই মানুষের দরকার হবে। অন্য ডেভেলপারদের সাথে মিলেমিশে কাজ করা, নতুন গবেষণা করা, সমস্যা সমাধানে শক্ত পদক্ষেপ নেয়া অথবা সৃজনশীল সব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার মত কাজের দিকে মনোযোগ দিতে পারবে মানুষ।
 
অনেকে ভাবেন সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট এর কাজ মানুষের ভূমিকা ছাড়া সম্ভবই না। তাদের মতে, ভাল একটা সফটওয়্যারে কোড ছাড়াও অনেক বিষয় জড়িত থাকে। ব্যবহার উপযোগী কাঠামো, কার্যকর টেস্ট ডেটা এবং মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষা করার মতো পরিবেশ ছাড়াও অন্যান্য অ্যাপ্লিকেশনের সাথে মিলিয়ে কাজ করার মত ইন্টারফেস প্রয়োজন হয় সফটওয়্যার ডেভেলপ করতে গেলে।
 
আর এসব কাজের জন্য মানুষের চিন্তার প্রয়োজন। একজন মানুষ এসব বিষয় যুক্তি দিয়ে যাচাই করবে আর বহু বছরের অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে অবশেষে কোড লিখবে। অর্থাৎ সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট এর কাজ করতে সবচেয়ে বুদ্ধিমান এআই-এরও মানুষের নির্দেশনার প্রয়োজন হবে।
 

এআই যেভাবে প্রোগ্রামারদের কাজের ওপর প্রভাব ফেলবে

 
এআই এর অগ্রগতির ফলে যে একটা বিষয় নিশ্চিত, তা হল ভবিষ্যতে সফটওয়্যার ডেপেলপারদের কাজের ধারা মৌলিকভাবে বদলে যাবে। নিউরাল নেটওয়ার্ক বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অনেক কাজ আগের চেয়ে উন্নত হবে। তবে নিকট ভবিষ্যতে মানুষের বদলে এ ধরনের সব কাজ করতে পারবে না এআই।
 
সাম্প্রতিক সময়ে অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপারদের চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে। আমাদের জীবন ও কাজের প্রতিটা ক্ষেত্রই ডিজিটাল হয়ে উঠছে, আর তাতে কাজে লাগানো হচ্ছে এআই। কিন্ত এআই ভিত্তিক সফটওয়্যার তৈরি, নিয়ন্ত্রণ, এর কাঠামো বানানো এবং ডেটা কাজে লাগানোর জন্যেও প্রয়োজন হচ্ছে মানুষের।
 
অর্থাৎ বর্তমান প্রচলনের দিকে লক্ষ্য করলে ধারণা করা যায় যে, ডেভেলপাররা ভবিষ্যতে কোডিং করা কমিয়ে দিবে। আর করলেও তারা কোড লিখবে কম। আর কোড লেখার চেয়েও কমে যাবে কোড রিভিউ করা বা সেটাকে অপ্টিমাইজ করার কাজ। ভবিষ্যতে ডেভেলপারদের আমরা ডেটা সায়েন্স অথবা ডিজিটাল উদ্ভাবনের মত আরো তাত্ত্বিক জায়গায় কাজ করতে দেখব।
 
সময়ের সাথে সাথে কোডিং এর কাজে এআই এর ব্যবহার বাড়লেও এআই এর করা সব কাজ যেন মানুষকে দিয়ে পরীক্ষা করিয়ে নেয়া হয়, সে বিষয়টা ডেভেলপারদেরই নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ, এআই এর মাধ্যমে হিসাব করে সবচেয়ে দক্ষভাবে কোনো ওয়েবসাইট এর ডিজাইন করলেই হবে না, বরং সেখানে কাজে লাগাতে হবে সৃজনশীলতা।
 

কর্মক্ষেত্র বদলে যাবে এআই এর কারণে 

 
কাজের ক্ষেত্রে সহযোগী হিসেবে এআই চমৎকার। বর্তমানে মানুষেরা নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা করে যেভাবে সফটওয়্যার নির্মাণ করে, ভবিষ্যতে সেই কাজটাই করবে এআই। যেমন অনেক কোম্পানিই এখন ‘পেয়ার প্রোগ্রামিং’ এর পদ্ধতি কাজে লাগাচ্ছে। এই পদ্ধতিতে বিভিন্ন বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা একসঙ্গে মিলে সফটওয়্যার তৈরি করে। আর তা করতে গিয়ে সবাই তাদের নিজেদের চিন্তা এবং অভিজ্ঞতা কাজে লাগায়। এভাবে ব্যবহারকারীদের জন্য আরো উপযোগী আর উন্নত অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। এভাবে একাধিক দক্ষ মানুষের বদলে ভবিষ্যতে হয়ত একটা এআই টুলই বিভিন্ন দিক দিয়ে প্রোগ্রামারদের সাহায্য করতে পারবে।
 
আবার এতদিন কোড ব্যবহার করা হত বিভিন্ন কাজ স্বয়ংক্রিয় করে তোলার জন্য। এখন কোড করা কোনো প্রোগ্রাম যেন নিজেকেই বিভিন্ন কাজের উপযোগী করার জন্যে গড়ে তুলতে পারে, সেই চাহিদা তৈরি হচ্ছে। এ ধরনের প্রোগ্রাম বা সফটওয়্যারকে বলা হয় ‘সফটওয়্যার ২.০’, যেখানে সফটওয়্যার নিজেই নিজেকে তৈরি করতে পারে মেশিন লার্নিং এবং এআই ব্যবহার করে।
 
‘সফটওয়্যার ২.০’-এ মেশিন লার্নিং এর কাজ হয় এমনভাবে, যেন প্রোগ্রামারের সঙ্গে কাজ করছে খুবই দক্ষ আর অভিজ্ঞ আরেকজন প্রোগ্রামার। সফটওয়্যারকে যা কিছু শেখানো হয়েছে বা ডেটা দেয়া হয়েছে, তার ভিত্তিতে সেটা পরামর্শ দেয়। এবং প্রচুর ডেটা ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরীক্ষা বা ‘টেস্ট রান’ চালাতে পারে। 
 
তবে মানুষ হিসেবে একজন সৃজনশীল ডেভেলপার এক্ষেত্রে ঠিক করে দেয় অ্যাপের নির্মাণ কীভাবে করা হবে। কারণ নির্দিষ্ট কোনো অ্যাপের প্রকৃত লক্ষ্য পূরণে এআই এর সব পরামর্শ কাজে নাও লাগতে পারে।
 
মোটকথা একজন ভাল ডেভেলপার হতে যে সৃজনশীলতা প্রয়োজন, তা থেকে অনেক দূরে আছে এআই। ফেসবুক এর মত প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারবে বা প্রতিষ্ঠানের ‘গ্রাফিক চার্টার’ নির্মাণ করতে পারবে, এমন এআই আসতে এখনো অনেক দেরি।
 
তাছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই যে পদ্ধতিতে শেখে, তাকে বলা হয় ‘ডিপ লার্নিং’। আর প্রশিক্ষণ ছাড়া ডিপ লার্নিং কাজ করতে পারে না। ডিপ লার্নিং এর মাধ্যমে শিখতে এআই এর সামনে বিভিন্ন পরিস্থিতি সংক্রান্ত প্রচুর তথ্য সরবরাহ করতে হয়। আর কোন তথ্য দিয়ে কীভাবে এআই নির্মাণ করা হবে, সেই প্রশ্নেই মানব প্রোগ্রামারদের কাজের ধারায় পরিবর্তন আসবে।
 

প্রোগ্রামিং জগতে এআই এর ভবিষ্যৎ 

 
এক কথায় বলা যায়, এআই এখনো প্রোগ্রামারদের জায়গা দখল করার মত অবস্থায় পৌঁছায়নি। তবে বর্তমান সময়ের অগ্রগতির দিকে লক্ষ্য করলে বোঝা যায় যে, অদূর ভবিষ্যতেই এআই সফটওয়্যার নিজের জন্য কোড লিখতে পারবে। কিন্তু সর্বোপরি এর মাধ্যমে মানব ডেভেলপারদের কাজই সহজ হবে, যাতে আরো কম সময়ে দ্রুত কোড লেখা যাবে।
 
সবকিছু বিবেচনা করলে নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, সফটওয়্যার ডেভেলপরারদের এখনই দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই। হয়তো ডেভেলপরারদের কিছু কিছু কাজ এআই এর হাতে চলে যেতে পারে। তবে অন্তত আগামী দুয়েক দশকের মধ্যে একজন দক্ষ ডেভেলপারের জায়গা দখল করতে পারবে না এআই। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *